বেচারা



আমার সঙ্গে বিনয়ের শেষ দেখা হয়েছিল বছর দুয়েক আগে , আমি সেদিন একটু তাড়াতাড়ি দোকান থেকে ফিরছি , বর্ষার রাত, বাড়িতে কৃষ্ণা আর বনি একা আছে, সেই ভেবেই একটু তাড়াতাড়ি দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে , সবে সাইকেলে উঠে হাত দশেক এসেছি, এমন সময় পাশের সুড়কির রাস্তা থেকে বিনয় বেরিয়ে এসে "এই দাঁড়া দাঁড়া " বলে পিচ-রাস্তায় দাড়িয়ে গেল | অবাক হলাম, জিজ্ঞাসা করলাম "কী ব্যাপার ?"
"তুই ভাল আছিস তো ?"
রাস্তায় ব্যাস্ত ভাবে সাইকেল থামিয়ে কেউ কুশল প্রশ্ন করেনা | আমি বিনয়কে অনেক দিন চিনি , বিনয় মানুষ খারাপ না, কিন্তু ও একটু এই রকম, কখন কী বলতে হয় সে সেন্সটা ওর চিরদিনই গোলমেলে | আমি কেমন আছি সে কৌতুহলে নয়, ওর কোনো দরকারেই আমাকে থামিয়েছে, এবং বুঝলাম, সেটা বলতে ও দ্বিধা করছে |  বেচারা !  নেমে বললাম "কী দরকার বলতো ?"
"তুই তো মাল করতে কলকাতা যাস, আমার একটা কাজ করতে পারবি ?"
"কী কাজ ?"
"একটা বই আনতে হবে , ইয়ে ..মানে গল্পের বই "

বিনয়ের তখন মাস দুয়েক হল বিয়ে হয়েছে , সন্দেহ হল আমাকে দিয়ে সচিত্র কামসূত্র বা ওই জাতীয় কোনো বই আনাতে চাইছে | আমার স্কুলের পাশে খাতা পেন চকলেটের ষ্টেশনারী দোকান | বিনয়ের আব্দার মেনে ওই় বই এনে দিলে বাকীরাও চাইবে | একটু কড়া সুরেই বললাম , " কী গল্পের বই? পঞ্চতন্ত্র না হিতোপদেশ ?" 
"না না,  মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুল নাচের ইতিকথা | " এমন ভাবে বলল যেন মানিক ব্যানার্জী আর তার বই না চেনার কোনো সম্ভাবনা কারোর নেই | তাও যদি বাংলায়  কোনো কালে ভাল নম্বর পাওয়ার রেকর্ড বিনয়ের থাকত ! আমার অবশ্য নামটা হাল্কা হাল্কা চেনা লাগছিল | নাইন টেনের বইতে এর একটা গল্প ছিল বোধহয় | আমি স্বস্তি পেয়ে বললাম , " শুক্রবার যাব, বইয়ের নাম লিখে কাল দিস দোকানে, শনিবার পেয়ে যাবি | "
"লেখা তো কাছেই আছে , এখনই দিয়ে দি তোকে "

বিনয়ের হাত থেকে বইয়ের নাম আর কুড়ি টাকা অ্যাডভান্স নিয়ে সাইকেলে ফিরতে ফিরতে আমি ভাবছিলাম  , বি.এ . পাশ  মেয়ে বিয়ে করে আর কী কী হ্যাপা সামলাতে হচ্ছে উচ্চমাধ্যমিক ফেল বিনয়কে ? তাও আবার প্রেম করে বিয়ে !

এরপর দুবছর বিনয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি, পরের দিন কলেজ স্ট্রিট থেকে বিনয়ের বই কিনে সি.আর অ্যাভিন্যুর মোড়ে চলতি বাসে উঠতে গিয়ে আমার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল | দুসপ্তাহ পর যখন নার্সিং হোম থেকে বেরোলাম তখন আমার হাঁটুর নীচের বাঁ পা, আর ব্যাঙ্কের হাজার পঞ্চাশ টাকা বিলকুল গায়েব হয়ে গেছে , নতুন সঙ্গী জুটেছে একজোড়া ক্র্যাচ | পুতুলনাচের ইতিকথা আমার ব্যাগ থেকে পড়ে কোথায় নৃত্য শেষ করেছে কে জানে ! প্রায় দেড়বছর আমি দোকানে বসিনি, কৃষ্ণা ছিল, ওই দোকান চালাত, আমি দোকানে আবার বসতে শুরু করার মাস ছয়েক পর বিনয়কে হঠাৎ দেখে চমক লাগল , সব কথা আবার মনে পড়ে গেল | বিনয়  ওর চিরাচরিত ভ্যাবলা হাসি মুখে এনে প্রশ্ন করল "কিরে , কেমন আছিস ?"
যেন আমার ভালমন্দ সত্যিই ওর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ, আমাকেও হাসতে হল ,"ভালোই, তোকে তো দেখিনি দীর্ঘ দিন | ছিলি কোথায় ?" 
" বাড়-দাঁতনে একটা ফিসারিজ প্রোজেক্ট চালু হয়েছে শুনেছিস ? আমি তো বছরখানেক হল সুপারভাইজারের চাকরি পেয়েছি ওখানে , থাকার ঘর ও দিয়েছে |"
আমি খবরটা জানতাম, তাও বললাম, "বাহ্, এত ভাল খবর ! খাইয়ে দে একদিন  | "
বিনয় একটু বিনয় করে হাসল, হেসে চুপ করে গেল , চাকরির সঙ্গে সঙ্গে ছেলে স্মার্টও হয়েছে দেখছি |
দুটো সস্তার পেন কেনার পর একটু ইতস্তত করে বিনয় বলল "তোকে সেই একটা বইয়ের কথা বলে ছিলাম মনে আছে ?" আমার সেটা না মনে থাকলে পৃথিবীতে আর কিছুই মনে থাকার কথা না , তাও বললাম "কী বই ?"
" সেই যে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের পুতুল নাচের ইতিকথা... তোকে কুড়ি টাকা অ্যাডভান্স ও দিয়েছিলাম | ভুলে গেলি ? "  প্রশ্নটার শেষে একটা অভদ্র কৈফিয়তদিহির টান এসে গেল ৷ কিন্তু আমি ওকে অনেক দিন চিনি, আমি জানি এ টানটা অনিচ্ছাকৃত । কথা কীভাবে বলতে হয় সে জ্ঞানটা আজও বিনয়ের হল না | বেচারা বিনয় ! 
কয়েক সেকেন্ড ভেবে বললাম "ওহ হ্যা মনে পড়েছে , এক কাজ কর, বইটার নাম লিখে দিয়ে যা, শুক্রবার করে মন্টু, আমার দোকানের  বাজার করতে কলকাতা যায় , শনিবার পেয়ে যাবি |" 
বিনয় পেছন ফিরতেই, আবার ডাকলাম, "এই শোন্‌ , ভুলে গেসলাম, শনিবার সকালবেলা ছেলেটাকে নিয়ে ওর মামাবাড়ি যেতে হবে , তিন চার দিন দোকান বন্ধ থাকবে, তুই পরের বুধ বেস্পতিবার আয় ।"
গভীরতম দূশ্চিন্তা প্রকাশের ভঙ্গি করে বিনয় বলল
"আমি তো সোমবার বাড়-দাঁতন ফিরে যাচ্ছি |"
"তাহলে, শুক্রবার একটু রাত করে আয় , পেয়ে যাবি |"
"বেশ তাই আসব তাহলে ..."
একটা ভরসাকামী ভাব এনে বাক্যটা শেষ করল বিনয় ৷ ঘাড় নেড়ে বললাম "হুম |" 

শুক্রবার দোকান বন্ধ করার মুখে যথারীতি হাজির বিনয় | ওকে একটু বসতে হল, মন্টু ছিলনা , আমিই খোড়া পায়ে গোডাউন থেকে বইটা খুঁজে এনে ওর হাতে দিয়ে বললাম "তুই পরে আবার এদিকে কবে আসবি ? "
"নাহ্ আবার কবে আসব ঠিক নেই |"
দোকান বন্ধ করে শাটারের তলায় চাবি লাগাতে লাগাতে বললাম  "অ্যাডভান্সটা বাদে, তোকে দিতে হবে আর ৯৩ টাকা |"
"ওটা ৯০ করে দে" ৯০ টাকা পার্স থেকে  দিয়ে , বিনয় সাইকেলে উঠতে যাচ্ছে , পেছন থেকে বললাম
"এই বইটা কিনতে গিয়েই, আমার অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছিল, বুঝলি ?"
থতমত খেয়ে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল বিনয় ৷ আমি ক্র্যাচ নিয়ে পাশে এসে হাঁটতে শুরু করলাম ,
বিনয়ও সাইকেল ধরে হাঁটতে শুরু করল, বলল "আমি সত্যি জানতাম না |"
"তোর জানার কথা না, আমি কাউকে বলিনি", স্বান্তনা দিয়ে বললাম | তারপর জিজ্ঞাসা করলাম "জানিস মাস ছয়েক আগে এই বাঁকটার কাছে আমার বউ কৃষ্ণার বডি পাওয়া গেছিল ? পুলিশ বলেছিল রাত্রে দোকান বন্ধ করে ফেরার সময় ওকে রেপ করার চেষ্টা করেছিল কয়েকজন, ও বাধা দিতে গিয়ে খুন হয় |"
"শুনেছি রে, সত্যি মানুষ জানোয়ার হয়ে গেছে " অপ্রয়োজনীয় সহানুভূতি ছড়াল বিনয় | নিস্পৃহ স্বরে বললাম "কিন্ত কৃষ্ণার খুন নিয়ে আমি অন্য একটা কথা জেনে ছিলাম পরে ৷ "
  "কী কথা?" উত্তেজিত হয়ে পড়ল বিনয় | 
   " বলছি , পেচ্ছাবটা করে নি দাঁড়া " বাঁকের ঠিক মুখে বিনয়কে দাঁড় করিয়ে প্রস্রাব করতে সময় লাগল আমার | যখন ঘুরে দাড়ালাম তখন দূর থেকে এই রুটের লাস্ট বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে | বললাম "আমার বউ কৃষ্ণা,  ছোট একটু তর্কাতর্কি, একটা গালাগালের জন্য খুন হতে হয়েছিল ওকে | খুন করে এখানে বয়ে এনে , কাপড় জামা ছিঁড়ে রেপের চেষ্টা বলে সাজানো হয়েছিল |"
" কে করেছিল ? " প্রায় রূদ্ধ কণ্ঠে প্রশ্ন করল বিনয় |
" আমিই। বনি মামাবাড়িতে ছিল, কৃষ্ণার একটা ছোট গালি "ল্যাংড়া আম " এইটুকুতে রেগে, রাগের মাথায় এটা করে ফেলেছিলাম |" অনুতপ্ত শোনাচ্ছিল আমার গলা | "তবে তোকে আজ ঠান্ডা মাথাতেই মারব |" একদম শান্ত গলায় পরের কথাটা বলে আমি ডান হাতের ক্র্যাচটা মাথার ওপরে তুলে এগোলাম | "না না না" বলে সাইকেল চালিয়ে পালাবার চেষ্টা করল বিনয়, সেটাই আমিও চাইছিলাম | লাস্ট বাসের নীচে বিনয় আর ওর সাইকেল দুটোই গুঁড়িয়ে গিয়েছিল | ওর  মাথা একটু ঠান্ডা হলে ওকে এভাবে মরতে হতনা | কিন্তু আমি বিনয়কে অনেক দিন ধরে চিনি , ও এরকমই | বেচারা !

কৃষ্ণার বডি এ জায়গাটাতে রেখে মাস ছয়েক আগে যখন ফিরছিলাম তখন যে অনুভূতিটা হচ্ছিল , বিনয়ের কাজটার পরেও দেখলাম সেই একই অনুভূতি ৷ খুন করতে বেশ ভাল লাগে ৷ এরপর  একটা দুটো করে করতে হবে মাঝে মধ্যে ...মাসে একটা করে করলে একটু রিস্ক আছে, ছমাসে একটা করে নিশ্চন্তে করা চলে | 













Comments

Popular posts from this blog

সুপরিচিতা

দুপুরের মেঘ