সুপরিচিতা

দরজার দিকে চেয়ে বসে ; ওই দরজা দিয়ে একটি মেয়ে ঢুকবে, কাউন্টার থেকে খাবারের ট্রে নিয়ে আমার ঠিক সামনের চেয়ারটার পাশের চেয়ারে এসে বসবে ৷ কৌতুক ও কৌতুহল চোখে সুন্দরী মেয়েটি , তারই প্রতীক্ষা করি ৷ দুমাস ধরে সপ্তাহে গড়ে তিন চারবার ক্যান্টিনে আসার টাইমিং মিলে গেলে এই চলে ; মেয়েটি আগে এলে আমি এগিয়ে যাই হিসেব করে সামনের চেয়ারটির পাশেরটি দখল করি ৷ নিলাজভাবে চোখ মেলি , চোখাচোখি হয়ে যায় ৷ এই চোখ চাওয়া সুন্দরের প্রতি টানই শুধু নয়, সুন্দর বলে মনে করি এ জানানোর চেষ্টাও ৷ কখনও চোখ আমি আগে নামাই , কখনও মেয়েটি ।  এত দিনে একটা কথাও হয় নি , দুদিকেরই ধৈর্য্য বা লজ্জা অসীম ৷ নিজের এই লজ্জাবনতার কারন জানি । কারন ভয় । ফিটফাট সেজে থাকি ৷ আসলে এই বিরাট কোম্পানিটির চারতলার একটি বিরাট আপিসে আমি মামুলী গ্রুপ ডি কর্মচারী । মেয়েটির আপিস কোন তলায়, কী করে , জানি না ৷ দেখে সন্দেহ হয় মেয়েটি রিসেপসানিষ্ট বা টাইপিষ্ট নয়, অফিসার র‍্যাঙ্ক , যাদের আজকাল আমি ম্যাডাম বলি ভদ্রতায় নয়, সমীহে  ৷ এখন যদি হঠাৎ এক দিন ঠিক সামনের টেবিলটা দখল করে বসে হাসি , কথা বলি, আমার শ্রেনীপরিচয়  সেখানে অবশ্য-প্রকাশ্য । তারপর ? জিজ্ঞাসার চিহ্নটা আলঙ্কারিক ৷ তার পরেরটা আমি জানি । ঘৃনা হয়ত অপ্রকাশিত থাকবে, অতিভদ্র হলে তাচ্ছিল্যটাও , কিন্তু হতাশা, বা করুনা ? সেটাও কি চাপতে পারবে মেয়েটি ? সমগোত্রীয় সমশ্রেনীর কাউকে সঙ্গী ভেবে এতটা সময় (হয়তবা স্বপ্নও) পেরিয়ে গ্রুপ ডি ! আমি হলে এতটা চাপতে পারতাম না । তার থেকে, এই ভালো, এই চলুক যত দিন না মেয়েটি নিজে এগিয়ে আসে ও নিজে হারিয়ে যায় ।

   একদিন সত্যিই মেয়েটি হারিয়ে গেল , আশ্চর্যভাবে ৷ দিন, কেটে গেল অপেক্ষায়, মেয়েটি এল না । পরের দিন, তার পরের দিনও । শেষটা, খাওয়ার নিয়ে টিফিনের পুরো সময়টা ক্যান্টিনে বসে রইলাম চার পাঁচ দিন ৷ সে মুখ দেখলাম না । এমনকি উঁকি মেরে পুরো বিন্ডিং যেটুকু দেখা সম্ভব, দেখার চেষ্টা করলাম , নিস্ফলা | ভীষন নৈরাশ্য এল, সর্বব্যাপী । কাজ করতে ভাল কোনোদিনই লাগে না ৷ লাগলে হয়ত অফিসার প্রোফেসার, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতাম , Msc পাশ করে গ্রুপ ডি হতাম না । এখন গা-ছাড়া ভাবটা আরও বেড়ে গেল । মনে হতে লাগল আর একবার ওই মুখটা দেখতে চাই , আর কিছু চাই না ৷ কি সুন্দর মুখ ! অমন আর দেখিনি ৷

মাস খানেক পরে আমার চাকরি চলে গেল ৷ কাজে মন ছিল না, আর সময়টা ছিল অর্থনৈতিক মন্দার ৷ ছাঁটাই-লিষ্টের একেবারে নীচে আমার নামটা দেখে মুক্তির আনন্দই হল প্রথমত, তারপর দুশ্চিন্তা , খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের দুশ্চিন্তা , বাপ-মরা ভাইঝির স্কুলের ফিজ নিয়ে দুশ্চিন্তা I বউদি অবশ্য সদ্য কিছুদিন পাশের কাপড় দোকানে কাজ শুরু করেছে , চালিয়ে নিতে পারলে ভাল । নাহলে আর কী ! গেল ! বেরিয়ে আসছি, ক্যান্টিনটার পাশে এসে মনে হল, চাকরি যাওয়ার পর এখন যদি তার সঙ্গে দেখা হয়, তাহলে পরিচয় দেওয়া সহজ হবে ৷ হেসে বলব , "চাকরিটা গেল ৷"  কি চাকরি সে প্রসঙ্গ উঠবে না, উঠলেই বা কি ! বলে দেব ওটা পাস্ট , আমি M.Sc পাস, অন্য আরেকটা চাকরি খুঁজে নেব ৷

বাড়িতে বসে চাকরির চেষ্টা করা শুনতে বেশ নির্ঝঙ্ঝাট লাগে ৷ কিন্তু বউদির সেলস গার্লশিপের চাকরির পয়সায় বসে খাওয়ার অবস্থা যখন দাঁড়ায় তখন ব্যাপারটা সম্মানজনক থাকে না । নিজের জমানো টাকা শেষ হওয়ার আগেই চাকরি একটা পেতে হবে, এই রকম ঠিক করে, আমি নাকে মুখে পড়ে, চাকরির পরীক্ষাগুলোতে সদ্যলব্ধ জ্ঞান বদবমির মত উগড়ে দিয়ে আসা শুরু করলাম । সবরকম চাকরির পরীক্ষা; রেলের সাফাই কর্মী থেকে ব্যাঙ্ক-পি.ও., এমনকী সিভিল সার্ভিস অব্দি I ৮ মাসের মাথায় আমার ব্যাঙ্ক ব্যালান্স শয়ের অঙ্কে নেমে এল , স্রেফ চাকরির ফর্ম ফিল-আপের খরচে ৷ বউদি অবশ্য তেমনভাবে কিছু বলেনি, "চেষ্টা কর , হবে " এরকমেই সীমাবদ্ধ ছিল উপদেশ । এরপর অ্যাপ্লিকেশান করতে গেলে বউদির কাছে হাত পাততে হত ৷ মাঝে কয়েকটা ফর্ম ফিলাপ করলামও না । আগের গুলোর এক্জাম দিতে যাই , যতদূর সম্ভব যাতায়াত খরচ বাঁচিয়ে । সম্ভবত বুঝতে পেরে, শেষটা বউদিই টিউশান জুটিয়ে দিল , ভাইঝি রিমা আর ওর কয়েকজন বন্ধু । KG2 এর দু-তিনজন ছাত্রী দিয়ে শুরু । ছাত্রছাত্রী বাড়ল ৷ তারপর আশেপাশে আরও এক দুজনকে বাড়ীতে গিয়ে টিউশন পড়াতে শুরু করলাম ৷ এভাবে চলছিল, ১৭ মাসের মাথায় আমি পরপর দুটো চাকরি পেয়ে গেলাম |

প্রথমত, মেডিক্যাল ফার্মে ল্যাব অ্যাটেডেন্ট এর চাকরি ; বলতে গেলে আমার এক স্কুলের বন্ধুই জুটিয়ে দিল নিজের কোম্পানিতে । বন্ধু জয়েন করেছিল ওর MSc এর ঠিক পরে, সাত বছরে পুরাতন ও প্রভাবশালী চাকুরে হয়ে উঠেছে ৷ এখানে জয়েনিং এর আগের দিন মেল পেলাম ব্যাঙ্কে প্রোবেশনারি অফিসার পোষ্টে আমি সিলেক্টেড I এটা 'অফিসার' গোত্রের চাকরি তার ওপর বিনা সুপারিশে ৷ আনন্দে ,অহঙ্কারে, আহ্লাদে প্রায় মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড় । বউদির সঙ্গে কথা বলে ঠিক করলাম, ব্যাঙ্কের চাকরিটাই করব, এবং পোষ্টিং কাছাকাছি হলে, সঙ্গে কিছু কিছু টিউশানও | মেডিক্যাল ফার্মের উপকারী বন্ধুও আমার এই ভাগ্যোদয়ে যথেষ্ট আনন্দ প্রকাশ করল I

 এতদিন নিজেকে নিয়ে দুর্ভাবনায় ছিলাম, ব্যস্ত যতদিন ছিলাম , সেই কৌতুকময়ীর পুরাতন কৌতুহলমুখর মুখ খুব বেশী করে মনে পড়েনি, আজ চাকরির দুশ্চিন্তা ফুরিয়ে যেতেই আবার মুখটা মনে পড়তে শুরু করল বেশী করে ৷ আহা এসময় যদি রাস্তাঘাটে কোথাও আবার দেখা হয়ে যায় ! খুব নির্দ্বিধায় আলাপ জমাতে পারব এবার; দুমাস কেন , দুমিনিটও অপব্যয় করব না । কো-ইনসিডেন্স এর বাংলা সম্ভবত সমাপতন । আমার জীবনে এতদিন খুব ছোটোখাটো সমাপতনও ঘটতে দেখিনি ৷ তাই ব্যাঙ্কে জয়েন করার দশ দিনের মাথায় টিফিন টাইমে যখন নীচের চায়ের দোকানে ঢুকতে গিয়ে একটা টেবিলে সেই অতিপরিচিতা, অপরিচিতাকে একা দেখলাম, তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা আমার ৷ ক্যাশ ডিপার্টমেন্টের সুগত বাবুকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে, এগিয়ে গেলাম । মেয়েটি একমনে খাচ্ছে , এখনও দেখতে পায়নি ৷ আমি মেলোড্রামাটিকভাবে , ঠিক আগের মত, সামনের চেয়ারটির পাশের চেয়ারটিতে এসে বসলাম । দীর্ঘপ্রার্থিত সেই মুখ ওপরে উঠল , আমি হাসলাম , সুপরিচিতির হাসি | এবং আশ্চর্য হলাম দেখে , মেয়েটি আমাকে চিনতে পারল না , অপরিচিত কারো মুখে পরিচিতির হাসি দেখলে মানুষ যেমন মনে করার চেষ্টা করে কোথায় পরিচয় , মুখ দেখে মনে হল তাই করছে ৷ তারপর যেন ব্যর্থ হয়ে, আগের মতই চোখে কৌতুক ও কৌতুহল নিয়ে তাকাল । আমি কোন রকমে বিস্ময় চেপে  রাখলাম , তবু বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল টেবিলের উল্টোদিকে ৷ পরদিন থেকে আবার আগের মতই শুরু হল সবিকছু , পারস্পরিক অপেক্ষা, সামনের পাশের চেয়ার , সুন্দর সেই দুটি চোখে ঘনঘন দৃষ্টিপাত , কৌতুক ও কৌতুহলময় ৷ এবারও এভাবেই চালিয়ে যেতে চাই , এবার দূর্বলতা আমার নয় , মেয়েটির ; এবং দূর্বলতা কী তা আমি জানি |

 প্রথম দিন , চা দোকান থেকে ফিরে সুগতবাবুকে সরি বলতে গেছিলাম | ভদ্রতার প্রথাসম্মত উত্তরই পেলাম , " কোনো ব্যাপার নয় ৷ অন্যমনস্কায় এরকম ছোটোখাটো অ্যাকসিডেন্ট তো হয়ই | আপনার শরীর টরীর সব.... ফ্যামিলির সবাই  ঠিক আছে তো ?" 
"  হ্যাঁ হ্যাঁ সব ঠিক আছে , পরিচিত একজনকে হঠাৎ দেখতে পেয়ে একটু তাড়াহুড়ো করে ফেলে ছিলাম । "
সুগত বাবু অবাক হয়ে বললেন , " পরিচিত ? আপনার সঙ্গে টেবিলে আর কাউকে দেখলাম না তো ! " আরও একদুজনকে জিজ্ঞাসা করে একই উত্তর পেলাম ৷

শুধু আমার মনে বাস করা , বাইরের জগতে অস্তিত্বহীনতা , হয়ত এটাই মেয়েটির দূর্বলতা , তাই হয়ত এগিয়ে আসে না , পরিচয় করে না । তা যাই হোক , আমি এতেই খুশি । এভাবেই চলুক যত দিন না মেয়েটি নিজে এগিয়ে আসে বা আবার নিজেই হারিয়ে যায় ।

Comments

Popular posts from this blog

দুপুরের মেঘ