হেঁটে যাই আমরা





সকাল সকাল যখন কেউ-কোত্থাও-নেই ভাবটা সবে দানা বাঁধতে শুরু করেছে তখনই, মন্টুর ফোনটা এল | খুব বিরক্ত লাগল আলমের | সকালের এই সময়টা সে ভালবাসে | টয়লেট পায় বলে ঘুম ভাঙে সকাল সকাল | টয়লেট থেকে ফিরে আলম বিছানায় বসে, ভাবতে শুরু করে, সে হঠাৎ মরে গেলে পৃথিবীতে কে কে কষ্ট পাবে | একটা গভীর একাকীত্ব বোধ আসে , চমৎকার একটা মাদকীয় অনুভূতি | 
ফোনটা ধরতেই মন্টুর  ফ্যাস ফ্যাসে কাশি শোনা গেল | একটা ঘুম ঘুম ভাব গলায় এনে আলম বলল "হ্যালো, কে ?"
"মন্টুদা বলছি | আমার নাম্বার ফোনে তুলে রাখিস নি ?"
গলায় ঘুম জড়ানো ভাবটা আরও দশ শতাংশ বাড়িয়ে দিল আলম , "হ্যাঁ ম-ন্টু-দা ব-ল ৷ "
"কালকের হিসেবে ৭২০ টাকার ঘাপলা হচ্ছে , মালিককে দেখাবার আগে সেটা ক্লিয়ার করতে হবে |"

"আমার হিসেবে ভুল হয়না ৷ ভাল করে হিসেব কর আরেকবার, তারপর মিললে ফোন করে জানিও, এবারে পুরো হিসেবটা ক্যালকুলেটারে করবে |"
 পরিষ্কার গলায় কেটে কেটে এবারের উত্তরটা দিল আলম | এটাই প্রথমবার না এর আগেও হিসেবে ভুল করে ফোন করেছে মন্টুচন্দর | মাধ্যমিকে অঙ্কে একচল্লিশ পাওয়া লোককে ফুড ডেলিভারী সেন্টারের ম্যানেজারশিপ দিলে এরকমই হওয়ার কথা | "গান্ডু শালা" মন্টুকে না, মালিক সাহাকে মনে মনে গালি দিল আলম। তারপর নিজে থেকে লাইনটা কেটে দিয়ে আবার শুয়ে  পড়ল | দশ মিনিট পরে উঠবে ৷
 

মেস থেকে বেরিয়ে আজ ব্যাঙ্গালোর কেমন যেন অচেনা মনে হচ্ছে, আলমের মাঝে মধ্যে এটা হয়,  চেনা রাস্তা, খুব চেনা মানুষও অচেনা লাগে | দুকামরার রান্নাঘর কাম `অফিসে' পৌছে আলম হাঁফ ছাড়ল | দুটো রুমই আদতে রান্নাঘর ,কোনে একটা টেবিল পাতা আছে, সেটাতেই বসে আলম অর্ডারের ফোন ধরে, আর হিসেব রাখে । স্মার্ট ফোনটা মালিকের , মাস ছয়েক হল, হোয়াটসঅ্যাপেও কিছু অর্ডার আসছে | মন্টু প্রধানত রাধুনীদের ওপর ম্যানেজারি ফলায়, আলমকে বিশেষ ঘাটায় না | মালিক কলকাতার লোক, রাধুনীরাও | ডেলিভারীর লোকজন অবশ্য স্থানীয় , হাল্কা হাল্কা কন্নড় জানা মন্টুই সেদিকটা সামলায় |

এখনও একটাও অর্ডার আসেনি , ছুটির দিন অর্ডার আসতে একটু দেরী হয় ৷ আলম টেবিলে বসে রান্নার ব্যস্ততা দেখছে, আসলে চোখ পড়ে আছে ঋতুর দিকে | ঋতুপর্ণা, বয়স ২৭-২৮ , বিধবা , তিন- সাড়ে তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে আসে রান্না করতে | ঋতুর সঙ্গে আলম ঠিকঠাক কথা বলতে পারে না | চোখাচোখি হওয়ার আগেই চোখ সরিয়ে নেয়, কালেভদ্রে চোখ মিললে অর্থহীন হাসি হাসে | প্রত্যুত্তরে ঋতুও হাসে ৷ ব্যাঙ্গালোর শহরের স্নিগ্ধতম হাসি | এই হাসি দেখেই আলম বুঝেছে ইতিহাসে নারী-সান্নিধ্য প্রত্যাশায় যুদ্ধের নজির কেন এত বেশী ! আজ ঋতুকে অন্যমনষ্ক লাগছে, মেয়ে কাঁদছে, সেদিকে নজর নেই | আলম গিয়ে কোলে নিল | মন্টুও যেন একটু বেশী চুপচাপ আজ । দুজনের মধ্যে কিছু চলছে কি? জোর করে চিন্তাটা মন থেকে সরাল আলম | ওদের দুজনের সম্পর্ক নিয়ে আলমের কী? ঋতুকে নিজের পাড়া থেকে এনে মন্টুই কাজে লাগিয়েছে । দুজনের সম্পর্ক দৃশ্যতই ঘনিষ্ঠ | এর মাঝে আলমের জায়গা নেই | তবু আলমের সমস্ত স্নায়ূ সতর্ক হয়ে রইল , ঋতুর ওপর মন্টু ম্যানেজারী জোর খাটাচ্ছে বুঝলে, আলম মন্টুকে খুন করে ফেলবে |

লাঞ্চ আর ডিনার ডেলিভারীর মাঝে বিকেলটা ছুটি। বিকেলে মেসে ফেরার সময় মন্টুকে পেছনে আসতে দেখে অবাক হল আলম । দ্রূতপায়ে আলমকে ধরে ফেলে মন্টু বলল "একটু কথা আছে, তোর মেসে চ "
কথা থাকলেই শুনতে বাধ্য নাকি আলম ! যত্তসব ৷ তিক্তস্বরে আলম উত্তর দিল "চল ৷ "
মেস থেকে আলমরা হাত পঞ্চাশ দূরে, এমন সময় ব্যাঙ্গালোরের খামখেয়ালী বৃষ্টি এল | বাকী রাস্তাটুকু ছুটে পেরিয়ে , দুজনে যখন মেসে আলমের রুমে ঢুকল তখন বাইরে ঝেঁপে বৃষ্টি এসেছে | আলমের দুই রুমমেটের কেউই এখনও কাজ সেরে ফেরেনি ৷ আলম নিজের বেডে বসে , মন্টুকে ইশারায় বসতে বলল | 
"বল মন্টুদা , কী ব্যাপার ?"
"তুই হাত পা ধুয়ে আয় , বসছি আমি "
"আমি একেবারে রাত্রে চান করি ,  জল থাকে না  এই সময় | কী বলবে বল "
দ্বিধা দ্বিধা মুখ করে মন্টু বলল "তুই কিছু টাকা ধার দিতে পারবি ?, এই ধর ১০-১২ হাজার ?"
টাকা ধার নিয়ে মন্টু ঋতুর সঙ্গে বিয়ে করতে চায় নাকি ? জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাট আসছে.জানালার পাল্লা বন্ধ করতে করতে , আলম বলল "হঠাৎ ?"
"একটু দরকার আছে | তোকে আমি মাস ছয়েকের মধ্যে ফেরত দিতে পারব |"
"এত টাকা নেই , ৪-৪.৫ হাজার দিতে পারি ,তবে দরকারটা কী না জেনে টাকা দিতে পারছি না | "
" আমার বৌয়ের বাচ্চা হবে , অপোরেশন করে, তাই টাকা চাই , আর কী জানতে চাস ?"
"খুব ভালো খবর | মিষ্টি খাওয়াও। আর তুমি হয়ত জানো না, আজকাল সরকারী হাসপাতালই বাচ্চা হওয়ার খরচ দেয় ৷বৌদিকে কালই কাছের হেল্থ সেন্টারে পাঠিয়ে দাও | " সরকারী বিজ্ঞাপনের ভাষা প্রায় হুবহু বলে গেল আলম | মন্টুকে খুশি নয় বিমর্ষ দেখাচ্ছিল , দরজার দিকে ফিরে বলল " আমি জানতাম না | ভালো | চলি তাহলে |"
"দাড়াও মন্টুদা |"
"কী ?" বিরক্ত গলায় বলল মন্টু |
" এই টাকার সঙ্গে ঋতুপর্ণার যোগ আছে ?"
একমুখ বিষ্ময় প্রকাশ করল মন্টু "তুই জানিস ? কীকরে ? ..ওহ ঋতু বলেছে তোকে ! "
অনেক কষ্টে রাগ সামলে নির্বিকার ভাবে তাকিয়ে রইল আলম | আন্দাজী ঢিলটা ঠিক জায়গায় লেগেছে ,বোঝা যাচ্ছে, লটঘটের পর এখন ঋতুপর্ণার আবোর্সানের টাকা যোগাড় করতে বেরিয়েছে মন্টু চন্দর | 
"আধার কার্ডের সরকারী বাবু ঘুস চাইছে ৫২০০০ টাকা , ঋতুর কথা বাদ দে, আমার সবকিছু বিক্রি করলেও অতো টাকা হবে না | চেনা পরিচিত, সবার কাছেই টাকা চাইছি | তুই যেটুকু পারিস দে |"
মন্টুর কথা শুনে আবার মাথাটা গুলিয়ে গেল আলমের, বলল "কার আধার কার্ড ?" 
"কার আবার | ঋতুর | পুলিশ এসবে এখন খুব কড়া | ঋতু বাংলাদেশ বর্ডার পেরিয়ে এসেছে ধরতে পারলে ওর জেল হয়ে যাবে | ওর জেলের থেকে ওর চিন্তা বেশী ওর মেয়েটাকে নিয়ে ৷ "
এবার গল্পটা খানিকটা বুঝতে পেরে, আলম অন্যমনস্ক ভাবে প্রশ্ন করল " তোমার সঙ্গে ঋতুর দেখা হল কী করে ?"
সন্দিহান চোখে তাকাল মন্টু "তোকে কতটা বলেছে ও ?"
খোলা দরজা দিয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আলম প্রশ্নটা না শোনার ভান করল | মন্টু বৃষ্টির দিকে চোখ রেখে যেন নিজেই নিজেকে বলতে শুরু করল
" আমার বোন থাকে বিটি রোড ফ্লাইওভারের নীচের বস্তিতে, বছর দেড়-দুই আগে বোনের ওখান থেকে বেরিয়ে ফ্লাইওভারের দিকে হাঁটছি, রাস্তার পাশের ফুটপাতে দেখলাম অনেকগুলো নেড়ি কুত্তা একটা মেয়েকে ঘিরে ধরে ঘেউ ঘেউ করছে৷ মেয়েটা একটা বাচ্চা কোলে ফুটপাতে বসে, ফ্যাসফেসে গলায় মাঝেমধ্যে হেই হেই করছে, আর কোলের বাচ্চাটা খুব কাঁদছে | রাস্তা দিয়ে, ফ্লাইওভার দিয়ে, অনেক লোক যাচ্ছে , গাড়িগুলো হুস হাস করে বেরিয়ে যাচ্ছে | কেউ কিছু করছে না | করবে কেন ? মেয়েটা গরীব , মেয়েটা ওদের জাত না ৷   আমিও ফুটপাতের জাত,  আমার গায়ে লাগল  ৷ কুত্তাগুলোকে তাড়ালাম , কাছে গিয়ে বললাম " এখেনে বসিস না, ডান দিকের ওই রাস্তা ধরে চলে যা, ওই ফুটপাতে লোক থাকে ৷ " মেয়েটা যেভাবে আমার দিকে তাকাল , তাতে বুঝলাম আমি ভুল করেছি , এ আমার জাত নয়, ফুটপাতের জীবন এর কাছে নতুন | তারপর ওকে বোনের ঝুপড়িতে নিয়ে গিয়ে তুলতে হল, না হলে হয়ত ওর বাচ্চাটা বাঁচত না ৷"
"ও বর্ডার পেরিয়ে ভারতে এল কেন ? "খানিকক্ষন চুপ থাকার পর প্রশ্ন করল আলম | 
"দাঙ্গা, হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গায় ওদের হিন্দু পাড়ার সবাই পালিয়েছিল , বর্ডার পেরোবে বলে | ওর স্বামী , ওই দাঙ্গাতেই মরেছে মুসলমানের হাতে |" একটা দুঃখের হাসি ও দীর্ঘশ্বাস সহকারে জানাল মন্টু ৷ আলম মুসলমান বলে, ব্যাঙ্গ করতে চাইছে কি মন্টু ? হতে পারে, তবে আলম এটা নিয়ে এখন ভাবতে চায় না | 
" আধার কার্ড বানাতে ৫২০০০ কেন ? ৫০ বা ৫৫ নাহয়ে ৫২ ?" প্রসঙ্গ পাল্টাটে চাইল আলম | আবার হাসল মন্টু " ৫০, ৫৫ বললে লোকজন দরদাম করে , ৫২ বলে তাই বাবুরা বুঝিয়ে দেয় পাকা দাম , চেঞ্জ হবে না ৷ " সত্যিই ব্যাপারটা জলের মত সোজা ,মানতে বাধ্য হল আলম | 
" কত টাকা জোগাড় হয়েছে ? "
" তুই ৫০০০ দিলে ২১০০০ হবে ৷ ফুড ডেলিভারীর সবাই কম বেশী টাকা ধার দিচ্ছে , আমার বাচ্চা হবে বলে ৷" আবার মুচকি হাসল মন্টু । 
"সাহাবাবুকে বলেছ ?" সাহাবাবু আলমদের ফুড ডেলিভারী সেন্টারের মালিক  |
মন্টুর মুখ আবার গম্ভীর হয়ে গেল ,বলল " সাহাবাবু খাতা খুঁজে ঋতুর মোবাইল নাম্বার বের করেছে , মাঝে মধ্যে ফোন করে , টাকার লোভ দেখায় , বাজে প্রস্তাব দেয় | আমি ওর কাছে টাকা চাইব না ভাবছি । "
আবার মাথায় রক্ত চড়ে গেল আলমের, "বাজে প্রস্তাব দেয় , ঋতু কিছু বলে না ? "
" না বলেনা , বললে কী হত ?" রাগী গলায় প্রশ্ন করল মন্টু | তারপর আবার নিজেই বলতে শুরু করল "কদিন হল সাহা ওকে চাকরির লোভ দেখাচ্ছে ৷ মাথিকেড়ির পল্লবী বারে নাচতে বলছে | টাকার দরকার , ঋতু দোনা মোনা করছে | হয়ত ও রাজী হয়ে যাবে ৷ আমি ওকে আটকাব না । টাকা তো দিতে পারব না , জ্ঞান দিয়ে কি পেট ভরবে ?  " আলম আর কিছু বলল না | 
"চ, এবার ডিনারের অর্ডার আসতে শুরু হবে ৷" বলে মন্টু বাইরে বেরিয়ে জুতো পায়ে গলাল |
রাস্তায় পা দিয়ে আলম বলল " আমি ঋতুকে ভালবাসি , বিয়ে করতে চাই |"
মন্টু চোখ ঘুরিয়ে আলমকে দেখল একবার , তারপর বিড় বিড় করে বলল  " আমি আন্দাজ করেছিলাম । তুই ঋতুর সঙ্গে কথা বল |"
" তুমি কি আমার ধর্মের কথা ভাবছ ?"
" আমি ধর্ম যেরকম বুঝি , তাতে তোর আমার ধর্ম এক | তুইও গরীব আমিও গরীব | পৃথিবীতে ধনী গরীব এই দুটো ধর্মই আমি মানি | কিন্তু ঋতু কী বলবে সেটা ওর ব্যাপার , আমি শালা কেন নাক গলাব ? তুই ওকে জিজ্ঞাসা কর |" মনে মনে মন্টুর ওপর শ্রদ্ধা হল আলমের ৷ 

রাত্রে যখন কাজের শেষে সবাই বেরিয়ে এল, আলম তখন তার  ব্যাঙ্গালোর-জীবনের সবচেয়ে উত্তেজিত সন্ধ্যাটা কাটিয়ে ফেলেছে  | অন্যান্য দিন মন্টু আর ঋতুকে একসাথে ফিরতে দেখেছে আলম , আজ আলমকে মুচকি হাসি উপহার দিয়ে মন্টু একাই বেরিয়ে গেল দ্রুত পায়ে | পায়ে পায়ে ঋতুর দিকে এগিয়ে গেল আলম | 
" ঋতুপর্ণা, তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল ৷"
মেয়েকে বাম থেকে ডান কোলে নিতে নিতে ঝতু বলল "কী কথা বল ৷"
"আমার তোমাকে ভাল লাগে , তোমার যদি আপত্তি না থাকে আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই | "
প্রায়  কবিতা মুখস্ত বলার মত করে বলল আলম |
"আমার বয়স একবছর বেশী তোর থেকে , আর আমার অনেক কথা তুই জানিস না । এরকম অনেক মেয়েকে দেখে ভাল লাগতে পারে ৷ সে নিয়ে অত চিন্তা করিস না " যেন আলমের বিরাট একটা সমস্যার সমাধান হয়ে গেল এমনি ভাব করল ঋতু | অালম একটু দ্বিধা করে বলল "মন্টুদা আমাকে তোমার ব্যাপারে সব বলেছে ৷ আমি সব জেনেই বিয়ে করতে চাই | তোমার জন্য না | নিজের জন্য  ।"
"মন্টুদা বলেছে ! ওহ মন্টুদা ..." ঋতুপর্ণা যেন প্রথমে অবাক হল তারপর অন্যমনস্ক |
"তুমি আমাকে ভেবে বোলো , কোনো তাড়া নেই ৷" আলম জানাল |
"হ্যাঁ পরে বলব ৷"
 আলমের আরও অনেক কথা বলার ছিল কিন্তু ঋতুকে ভীষন অন্যমনস্ক মনে হল | " তোমাকে বাসা অব্দি এগিয়ে দিই " বলে হাঁটতে শুরু করল আলম ৷  "সামনের গলিটা পেরোলেই আমার বাসা , তুই এবার ফিরে যা | " বলে  ঋতু আলমকে ফিরিয়ে দেবার আগে পর্যন্ত , পুরোটা রাস্তা দুজনেই চুপ রইল ৷

পরদিন সকালে যখন মন্টুর ফোন এল ,প্রায় সারারাত না ঘুমিয়েও তখন আলমের  ঘুম পাচ্ছে না । "হ্যা.. মন্টুদা বল ৷ "
"ঋতুকে পাওয়া যাচ্ছে না , আমি একটু আগে ফোন করেছিলাম , সুইচ অফ শুনে এখানে ওর বাসায় এলাম , নেই , ওর মেয়েও নেই ৷ দরজায় চাবি নেই এমনি শিকল তোলা | কাল রাতে ফিরেছিল কিনা তাও বুঝতে পারছি না |"
ভীষন উদ্বিগ্ন শোনাল মন্টুর গলা ৷ আলম বলল, "কিন্তু আমি কাল ওকে বাসা অব্দি ছেড়ে এসেছি ৷"
"একদম বাসার মুখ পর্যন্ত এসেছিলি ?"
"না , বাসার একটা গলি আগে ঋতু চলে যেতে বলল ৷ "
"দুর্  ..ওর বাসার সামনের গলিটাতেই তো মদের ঠেক, মাস্তান ছেলে গুলো বসে ৷ " খুব বিরক্ত শোনাল মন্টুর গলা ৷

 ঋতুর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি ৷ ওকে কি মস্তানরা জোর করে তুলে নিয়ে গেছে ? নাকি ঋতু নিজেই চলে গেছে কোথাও ? কেন চলে যাবে ? আলম প্রপোজ করেছিল বলে ? মন্টু পরে বলেছিল, ঋতু মন্টুর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়েছিল | মন্টু রাজি হয়নি, ভেবেছিল সেটা নেহাত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ , তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গে মন্টুর বউ আছে | ঋতু কি মন্টুর ওপর রাগ করে চলে গেছে ? ঋতুর ঘরে জামাকাপড় আসবাব সব খুব সামান্যই ছিল ৷ কিন্তু সেটা ও বাকী জামাকাপড় নিয়ে গেছে বলে নাকি, ওটুকুই ওর ছিল তা আলম মন্টু কেউই বুঝতে পারেনি | যদি চলে যায় কোথায় যাবে ? বারে নাচার জন্য সাহা ওকে নিয়ে যেতে পারে কি ? সব সম্ভবনা ভেবেছিল আলম ও মন্টু , দুটি গরীব মানুষের পক্ষে যতটুকু খোঁজ করা সম্ভব তার পুরোটাই করেছিল দুজনে ৷ ঋতুর ভোটার কার্ড নেই আধার কার্ড নেই , তাই পুলিশে কমপ্ল্যান করা যায় নি ৷ 

আলম নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে, ঋতুর খারাপ কিছু হয়নি, হয়তো সেই রাতে ঋতুর রাস্তা গুলিয়ে গেছিল, হয়ত খানিকটা হাঁটার পর ওর হাঁটতে ভাল লাগছিল, হয়ত যেদিন ক্লান্ত হবে , পথ খুঁজে পাবে , আবার ফিরে আসবে ৷ আজকাল সকাল বেলা বিছানায় বসে আলম মনে মনে ঋতুর ছবি আঁকার চেষ্টা করে ৷ একটা দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ, ধান কেটে নেওয়ার পর ফাঁকা মাঠ, পশ্চিম দিগন্তে যেখানে সূর্য ডুবছে, তার একটু আগে ঋতু হাঁটছে, ওর মেয়েও বড় হয়েছে, সেও তিড়িং তিড়িং করে হাঁটছে মায়ের পাশে পাশে | 





















Comments

Popular posts from this blog

সুপরিচিতা

দুপুরের মেঘ